Header Ads

হাইকোর্টে মুখ পুড়ল সরকারের





হাইকোর্টে ফের মুখ পুড়ল রাজ্য সরকারের। মহরমের কারণে একাদশীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জন সংক্রান্ত রাজ্যের নিষেধাজ্ঞা খারিজ হয়ে গেল হাইকোর্টে। আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ, মহরমের দিনও (একাদশী) প্রতিমা নিরঞ্জন হবে। আজ শুনানি চলাকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাকেশ তিওয়ারি রাজ্য সরকারকে কার্যত তুলোধনা করেন। পরে তাঁর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্দেশ দেয়, মহরমের দিনও নিরঞ্জন করা যাবে। মহরম সমেত সবদিন রাত ১২টা পর্যন্ত নিরঞ্জন করা যাবে। পাশাপাশি আদালত ডিজি ও সিপি-কে নির্দেশ দিয়েছে, মহরমের তাজিয়া ও নিরঞ্জনের জন্য আলাদা রুট করে নিতে হবে। কীভাবে রুট করা হবে সেজন্য আলোচনা করে নিতে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে নিরঞ্জন ও তাজিয়ার জন্য পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখতে বলেছে হাইকোর্ট।

শুনানির শুরুতে রাজ্য সরকারের অ্যাডভোকেট জেনেরাল কিশোর দত্ত গতকালের মতো আজও বলেন, যে কোনও ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে রাজ্য সরকার এই বিজ্ঞপ্তি জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি কোনও অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে যায় তাহলে তার দায়িত্ব কে নেবে ?

উত্তরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাকেশ তিওয়ারি বলেন, কোথাও কোনও জমায়েত থেকে যদি হিংসা ছড়ায় তাহলে প্রথমে জল কামান ব্যবহার করার নিয়ম। তারপর প্রয়োজন হলে মৃদু লাঠিচার্জ করা যায়। প্রথমেই তো গুলি চালানো যায় না। তা যেমন করা যায় না, তেমন কোনওকিছু ঘটার আগেই নিষেধাজ্ঞাও জারি করা যায় না। এরকম অনভিপ্রেত ঘটনার আশঙ্কা যদি থাকে তাহলে আগে থেকে সচেতন হওয়া উচিত। সরকারের হাতে ক্ষমতা আছে। সেটাকে কাজে লাগানো হোক। কিন্তু, একদিন প্রতিমা নিরঞ্জনে নিষেধাজ্ঞা কেন জারি হল তার কোনও ঠোস কারণ নেই।  প্রধান বিচারপতি ফের প্রশ্ন তোলেন, কীসের ভিত্তিতে ক্ষমতার প্রয়োগ করছে  সরকার ? ভিত্তিহীনভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ করা যায় না।

এজি বলেন, সরকার আগে থেকেই গোলমাল এড়াতে ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি দুর্গাপুজোর বিসর্জনে ৪ দিন দেওয়া হয়েছে। মাঝে একাদশীর দিনটা শুধু মহরমের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। একাদশীর পরে আরও তিনদিন বিসর্জন চলবে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এজি-র এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেন, তাহলে কি পুজো করার ক্ষেত্রে পঞ্জিকা, ক্যালেন্ডারের সিস্টেমকে বন্ধ করতে বলছে সরকার ? চাঁদের গতি কি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ?

প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ তোপ দেগে বলে, সরকারের হাতে ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতাকে খেয়ালখুশি মতো প্রয়োগ করা যায় না। আদালতও সেই অর্ডার দিতে পারে না। সরকারকে যদি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেটা ধাপে ধাপে নিতে হবে। নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞায় পার্থক্য রয়েছে। 





২৩ অগাস্ট মহরমের তাজিয়ার কারণে দশমীর দিন সন্ধে ৬ টার পর থেকে একাদশীর গোটাদিন প্রতিমা নিরঞ্জন করা যাবে না বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর এই মত সামনে আসার পর সরব হয় বিভিন্ন মহল। সরব হয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। সরকার এবিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এর বিরোধিতায় হাইকোর্টে তিনটি আলাদা জনস্বার্থ মামলা হয়। দশমীর দিন বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে রাত ১ টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত প্রতিমা নিরঞ্জন করতে দেওয়া হোক। মামলাকারীরা এই দাবি জানান হাইকোর্টের কাছে।

গত ২৮ অগাস্ট বিরোধীদের তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী। গান্ধি মূর্তির পাদদেশের এক জমায়েত থেকে বলেন “দুর্গাপ্রতিমা নিরঞ্জন নিয়ে BJP রাজ্যে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে।” দশমীর দিন নিরঞ্জন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে ফের বলেন, “একাদশীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জন হয় না।”




কলকাতা হাইকোর্টে তখন শুনানি চলছে। সওয়াল-জবাব চলাকালীন এক মামলাকারীর (উত্তম মজুমদার) আইনজীবী স্মরজিৎ রায়চৌধুরি বিচারপতিদের সামনে বলেন, “দুর্গাপুজোর সমস্ত আচার অনুষ্ঠান পালন হয় বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মেনে। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন তাজিয়ার জন্য দশমীর দিন সন্ধে ছ'টার পর প্রতিমা নিরঞ্জন হবে না। এই ধরনের নির্দেশিকা দেওয়ার অর্থই হল দু’ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। দুর্গাপুজো তো ইংরেজি নিয়ম মেনে হয় না। হয় বাংলা পঞ্জিকা মেনে। তাছাড়া ১৯৪৭ সাল থেকেই দুর্গাপুজোর সময় মহরম হয়ে আসছে। এত বছর তো তাজিয়া এবং নিরঞ্জনের মধ্যে কোনও সমস্যা হয়নি। তাহলে এখন কেন হবে ? কেনই বা এর জন্য প্রশাসনকে আলাদা করে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে ? আমরা তো আর আমাদের পুজোর রীতিনীতি বদলাতে পারব না।”

জবাবে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনেরাল কিশোর দত্ত বলেন, “সন্ধে ৬টা নয়, দশমীর দিন রাত ১০টা পর্যন্ত প্রতিমা নিরঞ্জন করা যাবে।”

উত্তরে স্মরজিৎ রায়চৌধুরী তৎকালীন ভারপ্তাপ্ত প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বলেন, “আপনি তো নিশ্চয়ই রানি মুখোপাধ্যায়ের পুজোর কথা জানেন ? শুনে হাসেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিশীতা মাত্রে। বলেন, “আমি এসব জানি না। তবে এটা জানি যে মুম্বই পুলিশ উৎসবের দিনগুলিতে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি দারুণ সামলায়।”

এরপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ দশমীর দিন রাত ১০টার পর কারা তাজিয়া বের করবে তা জানাতে রাজ্যকে নির্দেশ দেয়।


প্রধান বিচারপতির মুম্বই পুলিশের প্রশংসা যে মুখ্যমন্ত্রী ভালোভাবে নেননি তা বুঝিয়ে দেন। সাংবাদিকদের সামনে কারোর নাম না করে বলেন, “কেউ কেউ মুম্বই পুলিশকে ভালো বলছেন। কিন্তু, মুম্বইয়ে দুর্গাপুজো এবং মহরম একসঙ্গে হলে তারা কী তা সামলাতে পারত ?” পাশাপাশি VHP এবং RSS-কে আক্রমণ করেন তিনি।  


প্রতিমা নিরঞ্জন মামলা শুনানির জন্য উঠলেও জটিলতা কাটেনি। সরকার ও মামলাকারী পক্ষের আইনজীবীদের বাদানুবাদের জেরে রায় দেয়নি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিশীতা মাত্রের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ। পাশাপাশি ওইদিন নিশীতা মাত্রের অবসরগ্রহণের দিন থাকায় বুধবার (২০ সেপ্টেম্বর) মামলার শুনানির দিন ঠিক করে।


মামলার শুনানি শুরু হয় নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাকেশ তিওয়ারির বেঞ্চে। শুনানির শুরু থেকেই রাজ্য সরকার বিচারপতিদের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়ে। বিচারপতি তিওয়ারি বলেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে এই ধারণায় নাগরিকের ধর্মাচরণের অধিকারে বাধা দিতে পারে না রাজ্য। বলেন, “হিন্দু ও মুসলিমকে মিলেমিশে থাকতে দিন। তাদের মধ্যে বিভাজন রেখা টানবেন না।”

গতকাল AG কিশোর দত্ত বলেন, বেঙ্গল এবং কলকাতা পুলিশ অ্যাক্টে রয়েছে, কোনও মিছিলের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নির্দেশিকা জারি করা যেতে পারে। তখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাকেশ তিওয়ারি প্রশ্ন তোলেন, সরকার কীসের উপর ভিত্তি করে এই ধরনের নির্দেশিকা দিচ্ছে? কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে কি? সেই রিপোর্ট কোথায়? সরকার এভাবে সকলের উপর নির্দেশিকা জারি করে আসলে মানুষের স্বাধীনতার অধিকার হরণ করছে, যেটা সংবিধান অনুমোদন করে না।


তিনি আরও বলেন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বারবার বলছেন, এটাই একমাত্র রাজ্য যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রয়েছে- তাহলে কেন মনে হচ্ছে নিরঞ্জনের দিন তাজিয়া বেরোলে বা পরের দিন মহরম হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবে ? বেঞ্চের আরেক বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন প্রশ্ন তোলেন, যদি সম্প্রীতিই বজায় আছে, তবে নিষেধাজ্ঞা জারির দরকার হল কেন ? বলেন, আসলে নিষেধাজ্ঞার আড়ালে সরকার নিজের দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা করছে।

এরপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বলেন, সরকার কখনও ধর্মভিত্তিক ইস্যুতে বিভেদ তৈরি করতে পারে না। সরকারকে এসব ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সওয়াল-জবাব শেষে মামলায় আজ রায়দানের কথা জানায় বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চ।

No comments