Header Ads

যে ভাবে গঙ্গার ভাঙ্গনে বিপন্ন মালদা





 গঙ্গার ভাঙ্গনে বিপন্ন মালদা।মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর ভয়াবহ প্রভাবের পর এবারে ভাঙ্গন বিপর্যয়ের থাবা শিক্ষা ক্ষেত্রে।আর এই সর্বগ্রাসী ভাঙ্গনে তলিয়ে গেছে শিক্ষাঙ্গন।তলীয়ে যাওয়া একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫০ জন ছাত্রছাত্রীর হারিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়,খেলাধুলা,সর্বোপরি পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে অগ্রণী ভূমিকায় এগিয়ে এলো জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ।ভাঙ্গনে হারিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়,বইখাতা আর তলিয়ে যাওয়া শিক্ষার অধিকার খুদে পড়ুয়াদের ফিরিয়ে দিতে আগ্রহী  জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের চেয়ারপার্সন সহ অন্যান্য আধিকারিকেরা।

মালদার কালিয়াচক ৩ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত পার অনুপনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়।মূলত সমাজের পিছিয়ে পড়া প্রত্যন্ত এলাকা এই ব্লকের পারলালপুর অঞ্চল।অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষের জন্যই তৈরি এই পার অনুপনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৮৩ সালের ১৮ ই নভেম্বর চালু হওয়া এই বিদ্যালয় মূলত স্থানীয় মানুষের সাহায্য ও ভালোবাসাতেই আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠেছিল একটি মডেল বিদ্যালয়।২০০৫ সালে সরকারি সাহায্যে ২৮ শতক জমির উপর দ্বিতল এই বিদ্যালয় তৈরি হয়।নয়টি শ্রেণীকক্ষ,খেলার মাঠ,রান্না ঘর সহ বিদ্যালয়ের সকল সুবিধা নিয়ে নির্মিত হয় এই বিদ্যালয়।সময়ের সাথে এই বিদ্যালয় সবার কাছে জায়গা করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে।বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্তান স্নেহে গড়ে উঠতে থাকে বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন।এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিলো,কিন্তু বিপর্যয় শুরু বিধ্বংসী গঙ্গার কারণে।ধীরে ধীরে গঙ্গার পার ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসে বিদ্যালয়ের দিকে গত ২ বছর ধরে।স্থানীয় মানুষ সহ সেচ দপ্তর সকলের চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়ে চলতি মাসের ৫ তারিখ শিক্ষক দিবসের দিনেই গঙ্গার ভাঙ্গনে তলিয়ে যায় বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ অংশ।ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক,বিধ্বংসী ভাঙ্গনে হারিয়ে যায় বহু মানুষের স্বপ্ন।হারিয়ে যায় ১৫০ টি শিশুর শিক্ষাঙ্গন।বিপন্ন হয়ে পড়ে শিক্ষার অধিকার।

এমতো অবস্থায় কার্যত স্কুল ছুট হয়ে পড়ে ছিলো স্কুলের প্রায় ১৫০ জন খুদে পড়ুয়ারা।চিন্তিত ছিলেন এলাকার অভিভাবকেরা।সন্তান স্নেহে গড়ে তোলা বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরও খুঁজে পাচ্ছিলেন না দিশা।ঠিক এই সময় ত্রাতার ভূমিকায় এগিয়ে এলেন জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান আশিস কুন্ডু।ছুটে গেলেন ঘটনাস্থলে।কথা বললেন স্থানীয় মানুষ সহ খুদে পড়ুয়াদের সাথে।তাদের আবেগ ভালোবাসা আর অদম্য পড়াশোনার ইচ্ছা দেখেই চোখে জল এসে গেলো আশিস বাবুর।স্থানীয় মানুষদের সাথে কথা বলে ঘটনাস্থলেই গড়ে তোলা হবে এই স্কুল।আশিস বাবু জানান,"চলো সবাই মিলে স্কুলে যায়।আমরা এক সাথে পড়াশোনা করি।সি খুদে পড়ুয়াদের আবেগ দেখে আমি অভিভূত।এই শিশুদের শিক্ষিত করে তোলাটা যেমন শিক্ষক সমাজের কর্তব্য,তেমনি আমাদের সকলের দায়বদ্ধতা তাদের সঠিক চাহিদা পূরণ করা।এই শিশুদের পুনরায় বিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে"।

স্কুল হারিয়ে সন্তান বিয়োগের যন্ত্রনায় কাতর ছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলন চন্দ্র দাস সহ সমস্ত শিক্ষক।খুঁজে পাচ্ছিলেন না কিভাবে এই শিশুদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরানো যায়।তাই শিক্ষা সংসদের চেয়ারম্যান এলাকায় ছুটে আসায় কৃতজ্ঞ জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলন চন্দ্র দাস।তিনি বলেন,আমরা বিদ্যালয়টিকে স্নেহ যত্নের সাথে ভালোবাসার বন্ধনে আমরা সকলেই লিপ্ত ছিলাম।কিন্তু, বিদ্যালয় গঙ্গা গর্ভে তলিয়ে যাওয়ায় আমার সন্তান হারানোর ব্যথা অনুভব করছি।আমাদের চেয়ারম্যান আশিস কুন্ডু এলাকায় আসে বললেন নতুন বিদ্যালয় গড়ে তোলার"।

দীর্ঘদিন খেলাধুলা ও পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে স্বভাবতই খুদে পড়ুয়ারাও কিন্তু খুশি এই নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তে।তাদের চোখে মুখের হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছিলো খুশির কথা।তারাও ক্যামেরার সামনে জানালেন সুখ দুঃখ আনন্দের কথা।

এই পরিস্থিতিতে সব থেকে বেশি নজর কেরেছে যার ভূমিকা তিনি এই বিদ্যালয়ের একজন পার্স শিক্ষক।নাম ধনঞ্জয় রায়।২০০৫ সালে এই বিদ্যালয়ে পার্স শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি।তারপর ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই কখন এই শিশু গুলোকে নিজের সন্তান স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছিলেন তিনি।আপন ভালোবাসা আর যত্নে ধীরে ধীরে বড়ো করে তুলেছিলেন তাদের।তাই বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়া দিশেহারা ধনঞ্জয় বাবুও।গঙ্গার বিধ্বংসী ভাঙ্গনে ধনঞ্জয় বাবুও হারিয়েছেন সমস্ত কৃষি জমি,বাগান,বাড়িঘর সম্পত্তি।আজ নিঃস্ব ধনঞ্জয় বাবুর আশ্রয় গাছ তোলা।এখন সম্বল বলতে ধনঞ্জয় বাবু ও তার দাদার মাত্র এক বিঘা জমি।এই বিপর্যয়ের মুখে সন্তান স্নেহে বোরো করে তোলা শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এগিয়ে এসেছেন বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে।দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জীবনের শেষ সম্বল ওই এক বিঘা জমিও।আর তার এই দানের জমিতেই গড়ে উঠবে পার অনুপনগর  প্রাথমিক বিদ্যালয়।এই প্রসঙ্গে চোখে জল মুছতে মুছতে ধনঞ্জয় বাবু বলেন,"বর্তমানে আমার কিছুই নাই।বাগান,ভিটেমাটি,সমস্তই নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে।এক বিঘা জমি আছে।দাদার সাথে কথা বলে সেই জমি দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে এই শিশুদের জন্য আমি সি দান করছি।সকলের কাছে অনেক ভালোবাসা পেয়েছি।সেই ভালোবাসার জন্যই এই দান করেছি"।

স্বার্থ-হিংসা-লোভ যখন সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে বেথীর মতো।তখন ধনঞ্জয় বাবুর এই দান নিঃসন্দেহে একটা অনন্য নজির হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে জেলা তথা রাজ্যের শিক্ষসর ইতিহাসে।আমাদের কুর্নিশ ধনঞ্জয় বাবুকে।

No comments